রাজিয়া সুলতানা মীমের ছোট গল্প ‘স্বপ্ন স্পর্শ’

প্রকাশিত: ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৩১, ২০২০

ট্রেন স্টেশনের প্লাটফর্ম ছুঁয়ে দাঁড়াতেই শুরু হয়ে গেল হুড়োহুড়ি। যাত্রী নামার আগেই আরেক দল ট্রেনে ওঠার জন্য ব্যস্ত। এত ভিড় ঠেলে নামাটাই ঝক্কি কিন্তু উপায় নেই। নামতেই হবে। শক্ত হাতে ট্রলি ব্যাগটা ধরে নেমে এলো নীরা।

পড়ন্ত বিকেলে চিরচেনা প্লাটফর্মটিতে দাঁড়িয়ে হৃদয়টা যেন এক অদ্ভুত রকমের আনন্দে ভরে উঠল। সামান্য দূরেই রেলমাষ্টার দাঁড়িয়ে। অতি ব্যস্ততার সহিত টিকেট চেক করছেন। তবে চেনা সুরে ভেসে এলো না, “এই সপ্তাহেও?” কথাটি। সময়ের সাথে পরিবর্তন ঘটেছে কিছু চেনা মুখের। প্লাটফর্ম থেকে বের হয়ে আজ যথেষ্ট সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও খুব ইচ্ছে করল দরাদরি করে রিকশার ভাড়া ঠিক করতে।

- Advertisement -

হুড তোলা রিকশা চেনা পথ ধরে হালকা বাতাস চিরে এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যে। যতই এগোচ্ছে ততই যেন পুরোনো সুখস্মৃতি গুলো ভেসে উঠছে। কত পাওয়া, কত হারানো, কত ভালোলাগা মিশে আছে এ পথ জুড়ে। রাস্তার দু’পাশের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা গাছ গুলোও যেন খানিক মাথা নিচু করে স্বাগতম জানালো নীরাকে। সহস্রাধিক বিকাল, অজস্র ঘটনার সাক্ষী এই রাস্তা, এই গাছ, এই মাটি।

গাছের সারি পেরিয়ে সাজানো পরিপাটি পুরোনো দালান। এরপরই একটি ছোট্ট মার্কেট। যেখানে আজও আছে মানুষের ভীড়, আজও অনেকের চেহারায় ফুটে উঠেছে ক্লান্তির ভাঁজ। নীরা শুধু খুঁজে পেল না তার কিছু চেনা মুখ, যাদের সাথে কাটিয়েছে অনেকটা সময়। মার্কেটের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের সাথে বন্ধুদের সাথে পার করেছে কয়েক ঘন্টা।

তারপরই চোখে পরল তার বিদ্যাঘর, তার নিজের ফ্যাকাল্টি। সেই পুরোনো দালান, পুরোনো রুম আর পুরোনো বেঞ্চ। শুধু এসেছে নতুন কিছু মুখ। ফ্যাকাল্টির সিঁড়িতে আড্ডা দিচ্ছিল কিছু ছেলেমেয়ে। দৃশ্যটি দেখে মুহূর্তেই নীরার মনে পড়ে গেল একদিন এভাবেই আড্ডা দিতে দিতে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা করে পরের দিনের পরীক্ষার ১২টা বাজিয়েছিল।

ফেলে আসা দিন গুলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল নীরার। আবার সেই জম্পেশ আড্ডা, ক্লাসে পড়ে পড়ে ঘুমানো আর শিক্ষকের বকুনি খাওয়া। ১ মিনিট ক্লাসে আসতে দেরি করে ক্লাস থেকে সাসপেন্ড হয়ে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আড্ডা দিতে আর ফুচকা খেতে। কিন্তু শত চাইলে ও তা আজ সম্ভব নয়।

নিজের স্বপ্ন পূরণ করে নীরা আজ একটি বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে চলেছে। আজ সে তারই প্রাণপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হয়ে ফিরেছে তার ক্যাম্পাসে। একটা সময়ে যে রুমে বসে সে ক্লাস করত এখন থেকে সেই রুমে দাঁড়িয়েই নিজের অর্জিত জ্ঞান ভান্ডার উজার করে দিবে সে।

ফ্যাকাল্টি পেরিয়ে প্রশাসনিক ভবনের কাছে চলে এসেছে। ভবনের সামনের সবুজ ঘাসে পরা অস্তমিত সূর্যের আলোর মধ্য থেকে যেন নতুন আরম্ভের বার্তা আসছে। সত্যিই তো তার জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনাই তো হতে যাচ্ছে। যার জন্য করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে পৌঁছেছে তার গন্তব্যে।

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই কানে এলো এক পরিচিত কন্ঠ।” এই নীরা শুনছো? আরে এই দিকে তাকাও।” চমকে উঠল নীরা। কয়েক বছর পর শুনছে এই বলিষ্ঠ প্রেমময় কন্ঠটি। তবে নীরা আশ্চর্য হলো। বেশ কিছু বছর পরেও কেন এই কন্ঠটি তার পরিচিত! ঘুরে তাকিয়ে দেখল ব্যাগ কাঁধে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে সোহেল। নীরা কিছু বলার আগেই সে বলে উঠলো, “যে স্বপ্ন পূরণে ব্যাঘাত ঘটবে বলে বারংবার ফিরিয়ে দিয়েছ আমার হাত। সে স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তবে আজ কি ধরবে না আমার হাত! হাঁটবে না বাকিটা পথ আমার সাথে! ”