‘যার মরণ যথা, নাও বায়া যায় তথা’

প্রকাশিত: ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০২০

“যার মরণ যথা, নাও বায়া যায় তথা” প্রবাদটি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। স্বপনদার বেলায় প্রবাদটি চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে । গতকাল গোসল করতে গিয়ে স্বপন বাবু পানিতে ডুবে গেছেন। আজ সন্ধ্যায় তার লাশ পাওয়া গেছে । গতকাল দেখলাম তার রঙ মাখা শার্ট, সাবান, জালি ও প্রয়োজনীয় কাপড় কিনারেই পড়েছিল। তিনি যেভাবে রেখেছিলেন সেভাবেই। তিনি গোসল করতে সেই যে পানিতে নামলেন আর উঠলেন না । জীবন এখানেই থেমে গেছে । স্বপন বাবু আমার কাছের মানুষ ছিলো।

কথায় আছেনা, জাতের সাথে জাতের একটা আলাদা মিল আছে। ঠিক এ রকমই, সে ছিল আমার কাজের দিক দিয়ে জাত ভাই । আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়তাম তখন আমার আব্বা ইন্তেকাল করেছিলেন । বাবা নামের বটবৃক্ষটি যে কত উপকার, তা থাকাকালীন বোঝা যায় না । না থাকলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়, দুই অক্ষরের এই শব্দটি যে কত মূল্যবান। যাই হোক, আব্বা মারা গেলেন । আমাকে পড়াশোনার পাশাপাশি কোনো একটা কাজ শিখতে হবে। না হলে নিজেকে চালানোটা মুশকিল হয়ে যাবে। তাই জারিয়া থেকে প্রতিদিন সকালের ট্রেনে আমি গৌরিপুর যেতাম এবং রাতে ফিরে আসতাম এইভাবে আমি আর্ট শিখলাম পড়াশোনার পাশাপাশি । গৌরীপুর যার কাছে যেতাম উনার নাম ছিল নুর মোহাম্মদ ঠাকুর । তখন তো ছোট ছিলাম আমার বারবার প্রশ্ন জাগতো তিনি ঠাকুর হলেন কিভাবে । আমাদের সময়ে খুবই মান্য চিহ্ন ছিল, যে কারণে ভয়ে কোনদিন প্রশ্ন করা হয়নি । আমি যখন রংতুলির এই কাজটি শিখলাম। তখন আমার কাছে এই পেশার মানুষগুলো প্রিয় হয়ে উঠলো। আমি যখন সুসং কলেজে এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ি তখন জামাল আর্ট নামে নাজিরপুর মোড়ে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলাম । আমি রাস্তার পূর্ব পাশে আর দেশ মেডিকেল নামে বাবন ভাইয়ের একটি ফার্মেসি ছিল রাস্তার পশ্চিম পাশে । আরো আগে থেকে আমি স্বপন দা কে চিনি । দুর্গাপুরে যারা আর্টের সাথে জড়িত সবাইকে চিনি। অবাক করা বিষয় হলেও সত্য যে আমাদের সবারই এত মিল ছিল যে, বাহির থেকে এসে কেউ বুঝবে না আমরা একেক জন একেক ঘরের মানুষ । অবশ্য আজাদ সাইন তখন খুবই জনপ্রিয় ছিল।

- Advertisement -

তাছাড়াও আলো আর্ট, শতরূপা এ্যাড, আয়োজন এ্যাড, সাইদুল আর্ট, নিজাম আর্ট, রং তুলি আর্ট, আচিক আর্ট। আর হচ্ছে আশা আর্ট, যেটির প্রোপাইটর ছিলেন স্বপন চন্দ্র সরকার। দিন বদলের ফলে ডিজিটাল মেশিন এসে পড়ায় আর্টের কাজ আগের মত হয় না । তাই আমি পেশাটাকে পাল্টে নিলাম। স্বপনদা মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত আমার এই প্রিয় কাজটির সাথে যুক্ত ছিলেন। ভ্রাম্যমান আর্টিস্ট হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

খবরটা আমি প্রথমেই আমাদের সিনিয়র সাংবাদিক রফিক ভাইয়ের ফোনে শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সোমেশ্বরীর তীরেও গিয়েছিলাম। ডুবুরিদল অনেক চেষ্টা করেও তাকে খুঁজে পায়নি। হয়তো শত শত ড্রেজারে ক্ষতবিক্ষত সোরেশ্বরীর কোন গর্তে হারিয়ে গেছে আমার ভাইটি। আজ খুবই মনে পড়ছে তার কথা। তিনি যখনি আমাকে দেখতেন কাজের ফাঁকে দুই আঙুলের মাঝে রাখা তুলি সহ হাতটি উচিয়ে সালাম দিত এবং মুখটা ভরে হাসি দিত। জিজ্ঞেস করত আমি কেমন আছি? আফসোস আর কোনদিন হেসে হেসে বলবে না, কেমন আছি ।

সত্য বলতে কি, খুবই সাদামাটা মানুষ ছিল স্বপন বাবু। এই সোমেশ্বরী নদীতেই স্বপন দা কতবার গোসল করেছে হিসেব নেই । কত সাঁতার কেটেছে হিসেব নেই । এই চিরচেনা সেমেশ্বরীতেই তার মৃত্যু লেখা ছিল । এগুলো ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেল প্রবাদটি। যার মরণ যথা, নাও বায়া যায় তথা। পরিবারকে এই শোক কেটে উঠার শক্তি দিন মহান প্রতিপালকের কাছে এই মিনতি করি ।

উল্লেখ্য, রোববার সকাল ১০ টার দিকে নদীতে গোসল করতে নামলে বাংলা ড্রেজারের গর্তে পড়ে নিখোঁজ হয়ে যান স্বপন। পরে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে দুর্গাপুর ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দল নদীতে উদ্ধার কাজে নামে। সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ডুবুরি দল উদ্ধার প্রথমদিন তৎপরতা চালায়। কিন্তু মরদের কোনো খোঁজ না পাওয়া সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার কাজে নামে ডুবুরি দল। সকাল থেকে দফায় দফায় মরদেহের খোঁজ করে তারা। কিন্তু নদীর তলদেশে চোরাবালু ও অসংখ্য বাঁশের খুঁটি থাকায় মরদেহ না পেয়ে উদ্ধার কাজ সমাপ্ত করে চলে যায় ডুবুরি দল । এর কিছুক্ষণ পরই নদীতে মরদেহটি ভেসে ওঠে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে মরদেহটি উদ্ধার করে।

লেখক
জামাল তালুকদার
সম্পাদক ও প্রকাশক
সুসঙ্গ বার্তা