মা দিবসেই সন্তান হারালো মা !

প্রকাশিত: ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ, মে ১২, ২০২০

আমার তো মা নেই। সেই ছোটবেলায় মা চলে গেছেন না ফেরার দেশে। মাকে না দেখতে দেখতে মায়ের কথা মনেই থাকেনা। কিন্তু বছর ঘুরে আবার যখন মা দিবস আসে তখন ফেসবুকে বন্ধুদের লেখা পোস্ট ; ছবি আপলোড ইত্যাদি দেখে মনে পড়ে যায় আমারও তো মা ছিল ! তাই ভাবছিলাম মা দিবসে মাকে নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু লেখাটা তো ভাবার বিষয়, এটাতো হুট করে আসে না। মূলত শুয়ে-বসে দিন যাচ্ছে ।

যাইহোক, এবছর মা দিবসের দিন দুপুরে প্রয়োজনের তাগিদে আমি বাজারে গেলাম । আসার পথে গ্লাসের দোকান থেকে কাঁচ কিনলাম । কাঁচগুলো নিয়ে আসার পথে এমকেসিএম পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের গেইট সংলগ্ন একটি গাছ থেকে দুজন কিশোর কি যেন নামিয়ে আনছে। বেশ কজন মানুষও সেখানে তা অবলোকন করছে। আমিও এগুলাম, দেখলাম, গাছে উঠে একটি ছেলে পাখির বাসা থেকে বাচ্চাগুলো এনে এনে নিচের ছেলেটিকে দিচ্ছে। আমি ছেলে গুলোকে ডাক দিলাম কাছে আসলো না । আমি ছেলেগুলোকে চিনিনা । গাছে যে ছেলেটি ছিল সে আমাকে বলল মুজাহিদ কি আমার এখানে আসে কিনা । মুজাহিদ হচ্ছে একজন ছাত্র, তার বাড়ী বালিকান্দি এবং সে পড়াশুনার পাশাপাশি আমাকে সাহায্য করে । আমি বুঝলাম ছেলে গুলোর বাড়ী বালিকান্দি।

- Advertisement -

আমি বোঝাতে চাইলাম মায়ের কাছে সন্তান অমূল্য সম্পদ। বাচ্চাগুলো নিও না। তারা আমার কাছে না এসে দ্রুত হেঁটে চলে গেল । মা পাখিটি তার বাচ্চাগুলোকে খুঁজছে এ ডাল থেকে ও ডালে যাচ্ছে । যারা দাঁড়িয়ে দেখছিল তারা বললো বাচ্চাগুলো নামানোর সময় মা পাখিটা ছেলেটিকে বারবার উড়ে এসে ঠুকুর মারছিল। মা শালিকটি আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তার বাচ্চাগুলোকে বাঁচানোর জন্য । কথাগুলো শুনে আমার, আরও খারাপ লাগলো ।

পাশাপাশি কষ্টও হচ্ছে কারণ কাঁচগুলো টেন এম এম থাকায় অনেক ওজন ছিলো। মনটাকে মানাতেই পারছি না । মা শালিক পাখিটি পেরেশান হয়ে গেছে। মনটাকে আর স্থির রাখতে পারছি না। নিজের কাছে খুবই অপরাধী লাগছে। প্রথমত পবিত্র রমজান মাস এরপরেও আজ মা দিবস । সে পাখি হোক তবুও তো মা । আমার চোখের সামনে তার সন্তানগুলো অপহরণ হল আমিতো কিছুই করতে পারলাম না ইত্যাদি বিষয়গুলো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবছি এমন সময় আমার পরিচিত একজন রিকশাচালক এমদাদুল এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলো। আমাকে দেখে বললো ভাই উঠো । জিজ্ঞেস করল, কই যাইবা। আমি বললাম বাসায় । ও আমাকে বাসায় নামিয়ে দিলো । জোর করে ভাড়া দিতে চাইলেও সে নেয়নি । আমার মনটা অস্থির অস্থির লাগছে গ্লাসগুলো বিছানার উপর রেখে আবার বের হয়ে পড়লাম, দেখিতো ছেলেগুলোকে পাই কিনা । এমকেসিএম স্কুল মাঠ হয়ে আবার বালিকান্দির রাস্তায় উঠলাম। হাঁটছি আর হন্যে হয়ে ছেলেগুলোকে খুঁজছি। হাঁটতে হাঁটতে শাওনদের বাসা পার হয়ে ইট ভাটা সংলগ্ন দোকান গুলোর কাছে গেলাম । না পেলাম না । মনটা মানছে না মুজাহিদের বাবার নাম্বারে কল দিলাম । দুনা-মুনা করে আবার কেটে দিলাম । আমার আরেকজন সহকারী আলম তার বাড়িও বালিকান্দি । আলমকে ফোন দিলাম । সে ফোন ধরেনি।

পথে পরিচিত আরেকজনের সাথে দেখা হল জিজ্ঞেস করলো কই যাই, বললাম এরকম দুটো ছেলে কে দেখছেন কিনা । তিনি বলল না । ফিরে আসছি আর বারবার বালিকান্দির দিকে পেছন ফিরে তাকাচ্ছি । আস্তে আস্তে আবার গাছের নিচে এসে পড়লাম, দেখলাম বিদ্যুতের তারে দুটো অসহায় শালিক পাখি বসে আছে । আমি গাছের নিচে মসজিদের পাশে বসে রইলাম । আল্লাহর কি খুদরত অমনি দেখি আলম বাজার থেকে বাড়ি যাচ্ছে । আলম কে পেয়ে আমি আসমান পেয়ে গেলাম ।

আলম কে আমি গাছটি দেখিয়ে বললাম, দেখ আলম এই গাছটিতে একটি পাখির বাসা ছিল । এই বাসা থেকে বালিকান্দির দুইটি ছেলে তিনটি বাচ্চা নিয়ে গেছে । মা পাখিটা তার বাচ্চাদের খুঁজছে। আমারও মনটা খুব খারাপ লাগছে । আমার কথাগুলো শুনে আলমের মায়া হল । আমার অস্থিরতা দেখে সে বললো ভাই তুমি কোন চিন্তা করো না । আলম চলে গেল যোহরের আযান হল আমি তো মসজিদের পাশেই বসা । অজু করে মসজিদে গেলাম নামাজ পড়লাম বাচ্চা গুলো যেন মায়ের কাছে ফিরে আসে, দোয়া করলাম । বাসায় আসলাম । বিছানাতে হেলান দিয়ে আলমকে ফোন দিলাম । সে বলল ভাই পাইছি বাচ্চা নিয়ে আইতাছি। শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল আবার তাড়াতাড়ি মসজিদের কাছে গাছের নিচে গেলাম ।

আমি যতই এদিক-ওদিক তাকানোর চেষ্টা করি কে যেন আমাকে বালিকান্দির দিকেই ঘুরিয়ে দেয় । অপেক্ষা করতে করতে বেশ কিছুক্ষণ পরে ছেলেগুলো পাখির ছানাগুলো নিয়ে আসলো । পাখির বাসায় ছানাগুলোকে রাখল আমি ছেলেগুলোকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলাম তারা তাদের ভুল বুঝতে পারল এবং বলল তারা এমন কাজ আর জীবনে করবে না । আলমকেও মাথাটা হাতিয়ে দিলাম এবং আমি বাসায় চলে আসলাম ।

দিন শেষে ইফতারি সামনে নিয়ে বসলাম এমন সময় ফোন দিল প্রত্যক্ষদর্শী রিপন নামে একজন । তার বাসার সাথেই গাছটি সে বলল দাদা, কে যেন গাছে ওঠে তার শরীর থেকে গেঞ্জিটা খুলে পাখিগুলো গেঞ্জিতে করে নিয়ে গেছে । আফসোস করলাম, সারাদিন কষ্ট করেও মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারলাম না। দুঃখী মায়ের কান্নাই সাথী হল শেষে।

কবি লিখেছেন “বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে” । পরিশেষে বলব যার যে আবাসস্থল, তাকে সেখানেই থাকতে দেওয়া উচিৎ। পৃথিবীর সকল মা সুখী হোক। তার সন্তানকে ভালোবেসে বাঁচুক এবং সন্তানের ভালোবাসায় বাঁচুক । মহান প্রতিপালক সবাইকে বুঝার শক্তি দিন (আমীন..) ।

লেখক,
জামাল তালুকদার
সম্পাদক ও প্রকাশক
সাপ্তাহিক সুসঙ্গ বার্তা