সকাল ৮:৫৮ | ২১ জুন, ২০২১ | ৭ আষাঢ়, ১৪২৮ | ১০ জিলকদ, ১৪৪২

বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ: প্রশিক্ষণে জনপ্রতি খরচ ৪৩ লাখ

আনোয়ার হোসেন মন্ডল

প্রধান বার্তা সম্পাদক

প্রকাশিত: ১১:৫৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২১
শেয়ার করুন

অনলাইনঃ করোনার ধাক্কা কাটাতে অর্থ সাশ্রয়ে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন প্রকল্পের অহেতুক অর্থ খরচ কমানোর নির্দেশও দিয়েছেন। কিন্তু এসব পরামর্শ ও নির্দেশনা পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্থাপনে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল প্রকল্পে ১৪০ জনের বৈদেশিক প্রশিক্ষণে খরচ ধরা হয়েছিল ৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। এখন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ১৫৫ জনের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৬৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে মাথাপিছু বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ২২ হাজার ৫৮০ টাকা।

Advertise

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধীনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই বিদেশ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হবে। এদিকে প্রকল্পটির ব্যয়ের সঙ্গে মেয়াদ বৃদ্ধিরও আবেদন করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা।

Advertise

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন,ইতোমধ্যেই প্রকল্পটির প্রক্রিয়াকরণ শেষ হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর গত বছরের ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন করা হয়েছে। এটি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) আগামী সভায় উপস্থাপনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)।

Advertise

একনেক সভার জন্য তৈরি প্রকল্পের সার সংক্ষেপ সূত্রে জানা গেছে,প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ১ হাজার ৩৬৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে কোরিয়ার ঋণ ছিল ১ হাজার ৪৭ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, বিএসএমএমইউ’র নিজস্ব তহবিল থেকে ১৭৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১৪৫ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এখন প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ১ হাজার ৫৬১ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে ১৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। বর্ধিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিলের বাড়ছে ১৯৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং বিএসএমইউ’র ১ কোটি ৯ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছর। এখন প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে বিরাজ করছে ধীর গতি। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় হয়েছে মোট ৬০৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৪৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। এছাড়া ভৌত কাজের বাস্তব অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. জুলফিকার বলেন, ‘বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের ডাক্তার, নার্স ও যারা হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত তাদের পাঠানো হচ্ছে বৈদেশিক প্রশিক্ষণে।’ তাছাড়া এ খাতে ব্যয় বাড়ছে না বলেও জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটির ঋণ চুক্তি, অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়াকরণ এবং পরামর্শক নিয়োগ ও ডিজাইন করতেই অনেকটা সময় চলে গেছে। মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের জুন। এরপর কোভিডের কারণে ১১ মাস প্রকল্পের কার্যক্রম প্রায় বন্ধ ছিল। ফলে এখন ফের মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবা খাতে অনেক উন্নতি সাধন করলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো বিশ্বমানের চেয়ে পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশে সাধারণত টারশিয়ারী লেভেল হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। সাধারণ জনগণকে কম মূল্যে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা বাড়ানোই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

বিএসএমইউতে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সেখানে ইমার্জেন্সি মেডিকেল কেয়ার সেন্টার, গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি ও হেপাটোবিলিয়ারি সেন্টার, চাইল্ড অ্যান্ড মাদার হেলথ কেয়ার সেন্টার, কার্ডিও অ্যান্ড সেরেব্রো ভাসকুলার সেন্টার, কিডনি ডিজিজেস সেন্টার, আইসিইউ এবং কেন্দ্রীয় ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি বিভাগ স্থাপনের জন্য ১ হাজার ৩৬৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যযে ২০১৬ সালের জুন হতে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়নের জন্য ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো করা হয়। এখন প্রথম সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে- অনাবাসিক ভবন নির্মাণ, পরামর্শ সেবা, চিকিৎসা সরঞ্জাম পরামর্শ, নির্মাণ তদারকি পরামর্শ, মেডিকেল এবং সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র সংগ্রহ, কম্পিউটার ও আনুষাঙ্গিক, স্থানীয় ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ, কম্পিউটার সফটওয়্যার ও যানবাহন ক্রয়।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসাবে বলা হয়েছে-

ব্যাপ্তি পরিবর্তন

বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কর্তৃক আরোপিত উচ্চতার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রস্তাবিত ১১তলা বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনের পরিবর্তে দুই বেজমেন্ট বিশিষ্ট নয়তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যয় হ্রাস বৃদ্ধি

প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ কাজের ব্যয় বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা সরঞ্জামাদির ব্যয় হ্রাস, ইডিসিএফ’র সাথে চুক্তি অনুযায়ী সরকারি কর বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাস্তবায়ন মেয়াদ বৃদ্ধি

নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্মাণের জায়গায় কিছু প্রতিবন্ধকতা সংক্রান্ত জটিলতা অপসারণের জন্য মূল কাজ শুরু করতে বিলম্ব হওয়ায় এবং নির্মাণ কাজ শেষ করার পর কিছু সফিস্টিকেটেড এবং উচ্চ গুণাগুণসম্পন্ন মেডিকেল এবং সার্জিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট করার জন্য প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস অর্থাৎ জুন ২০২২ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা আবশ্যক।

নতুন ইকনমিক কোড অন্তর্ভুক্তিকরণ

সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে নতুন বাজেট এবং অ্যাকাউন্টিং ক্ল্যাসিফিকেশন সিস্টেম (বিএসিএস) চালু করার জন্য নতুন ইকনমিক কোড অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করা প্রয়োজন।

নতুন অংশ সংযোজন

কিছু প্রয়োজনীয় অপারেটিং কার্যক্রম যেমন- বিজ্ঞাপন ব্যয়, অডিও ভিডিও উৎপাদন, প্রাক চালান পরিদর্শন, স্থানীয় প্রশিক্ষণ, পরীক্ষার ফি, মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর সংশোধিত ডিপিপিতে সংযোজন করা হয়েছে।

কাস্টম ডিউটি খাতের কোড পরিবর্তন

নতুন ইকনোমিক কোড চালু করার ফলে অপারেটিং উপাদান হিসেবে কাস্টম ডিউটি অন্তর্ভুক্ত করতে ডিপিপি সংশোধন করা প্রয়োজন।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আয়কর (আইটি) খাতে বরাদ্দ দেওয়া

মূল্য সংযোজন কর এবং আয়কর নতুন খাত দুটি সংশোধিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মোসাম্মৎ নাসিমা বেগম পরিকল্পনা কমিশনের মতামত দিতে গিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পটির ব্যাপ্তি পরিবর্তন, ব্যয় হ্রাস বৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত কার্যক্রমগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষাসহ প্রকল্পের অসমাপ্ত কাজ শেষ করা প্রয়োজন। প্রকল্পের উদ্দেশ্য সাধন তথা বিএসএমএমইউ’র আওতায় বিশেষায়িত স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়ানোরর লক্ষ্যে প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।’

সূত্রঃ সারাবাংলা
বাআ/আ

Advertise

এই বিভাগের সর্বশেষ