বিপন্ন  টাঙ্গুয়ায়র হাওর : হুমকিতে জীববৈচিত্র্য 

প্রকাশিত: ৩:৪৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৫, ২০২১
দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট জীববৈচিত্র‍্যের অনন্য আধার ও পর্যটন স্পষ্ট মাদার ফিসারিজ খ্যাত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে প্রতিনিয়তই  নলখাগড়া, চাইল্যাবন, হিজল করচ গাছের ঢালপালা জ্বালানী হিসাবে অবাধে কেঁটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় এক শ্রেণীর অসাধু ব্যক্তিরা। এতে করে নষ্ট হচ্ছে হাওরের সৌন্দর্য উজাড় হচ্ছে হাওরের নয়নাভিরাম ঘন সবুজ বন। হুমকিতে রয়েছে হাওরের জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকজোড়ে হিজল-করচ নলখাগড়া , চাইল্যাবন সহ বিভিন্ন জাতের গাছ গাছালি সমৃদ্ধ অতিথি পাখিদের অভয়াশ্রম । যা শীতকালে অতিথি পাখির অবাধ অভয়াশ্রম হলেও এখন গাছ গাছালি ডালপালা ও গাছ কেটে নেয়ায় পাখিদের আশ্রয় স্থাল সংকোচিত হওয়ায় দিনদিন কমছে অতিথি পাখির সংখ্যাও। শুধু তাই নয়!  মেঘালয় পাহাড়ের কূলঘেষা সবুজের সমারোহে বেষ্টিত অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর টাঙ্গুয়া হাওর এখন অনেকটাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য হারানোর শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি  বিপন্ন হচ্ছে হাওর, বিপন্ন হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও বিলুপ্ত হতে চলছে টাঙ্গুয়ার হাওরের হিজল করচ সহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছগাছালি । 
বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ‘৯০ দশকের শুরুতে পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার বিষয়টি মিডিয়ায় উঠে আসলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের আটটি স্থানকে ষ্পর্শকাতর উল্লেখ করে পরিবেশ সংরক্ষণের দাবী উঠানো হয় তখন বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সঙ্গে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর,যশোহরের মাঠচান্দ ,কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ও সোনাদিয়া দ্বীপ টেকনাফের উপকুলীয় অঞ্চল , সিলেটের কুলাউড়ার মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ও হাকালুকি হাওর পরিবেশের জন্য ষ্পর্শকাতর এলাকা হিসাবে ঘোষিত হয় এবং এই আটটি স্থানে ৯৭ সালে ২৮ আগষ্ট জারিকৃত পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা কার্যকর হয়।
সারা বিশ্বে রামসার আওতাভুক্ত এলাকা হচ্ছে ১০৩১ টি এর মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওর একটি অন্যতম এলাকা। রামসার কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসাবে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি ঘটে ১৯৯২ সালের মে মাসে। পরবতর্ীকালে রামসার সাইট হিসাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায় সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর। রামসার ঘোষণার পর টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রচলিত ইজারা ব্যবস্থা বন্ধ এবং কতর্ৃত্ব পরিবর্তিত হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর একটি বৃহৎ জলমহাল হিসাবে কতৃর্ত্ব ছিল শুধু মাত্র ভূমি মন্ত্রনালয়ের হাতে।
এখন পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের হাতে। রামসার ঘোষণার পর টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের দিক নিয়েও নতুন সম্ভাবনা জেগে উঠে।
সম্প্রতি সরজমিনে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে দেখা যায়,হাওরপারের জনগন জ্বালানী চাহিদা মেটাতে নলখাগড়া, বনতুলসী, চাইল্যাবন, হিজল করচ গাছের ডালপালা ছোট ছোট নৌকা বোঝাই করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে নির্বিগ্নে।
টাঙ্গুয়ার হাওর গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি মনির হোসেন বলেন, জ্বালানী চাহিদা পুরণের জন্য কিছু লোক বনতুলসী,চাইল্যাবন ও নলখাগড়া কেটে নিয়ে যায়। এগুলো রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব তো আপনাদের? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কি করবো,এগুলো তো কমিউনিটি গার্ড দেখবে। আর বিশেষ করে আনসাররা তো সারাদিন ক্যাম্পে বসে থাকে। আনসাররা তৎপরতা বাড়ালে এগুলো রক্ষনাবেক্ষন করা সম্ভব হবে।
টাঙ্গুয়া হাওর পাড়ের ছিলানি তাহিরপুর গ্রামের আব্দুল হালিম বলেন, নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা আনসাররা নিজেদের পকেট ভারী করতে  মাছ ধরা ও গাছ কাটার সুযোগ দিচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে  বিপন্ন হতে পারে হাওরের পরিবেশ ও জনবসতি।  নলখাগড়া চাইল্যাবন হিজল করচ গাছের ঢালপালাগুলো কেটে গোলাবাড়ি ও মন্দিয়াতা ক্যাম্পের সম্মূখ দিয়ে নিয়ে যায়।অথচ আনসাররা কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের মন্দিয়াতা গ্রামের সানজু মিয়া  বলেন, গত দুই দশক ধরে টাঙ্গুয়ার হাওরে গাছকাটা চলছে। এখন হাওরে গাছপালা আগের মত নেই। তিনি আরো জানান,প্রতিদিনই বনখেকোরা প্রকাশ্যে নৌকা বোঝাই করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে নলখাগরা, চাইল্যাবন ও হিজলবন।
এ প্রসঙ্গে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পদ্মাসন সিংহ বলেন,হাওরপারের লোকজনদের জনসচেতনতামূলক কর্মশালার ব্যবস্থা করা হবে। যাহাতে তারা নিজ দায়িত্ব থেকেই টাঙ্গুয়া হাওর সুরক্ষায় দায়িত্ব পালন করে থাকে। এছাড়াও গত শুক্রবার সকালে টাঙ্গুয়া হাওরে কর্তব্যরত কমিউনিটি গার্ড নলখাগড়া, চাইল্যাবন, হিজল করচ গাছের ঢালপালাসহ ৪টি নৌকা আটক করেছে। আটকের সময় বনখেকোরা দৌড়ে পালিয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা
সিন্দু চৌধুরী বাবুল বলেন,যাহারা টাঙ্গুয়ার হাওরের  নলখাগড়া, চাইল্যাবন, হিজল করচ গাছের ঢালপালা কেটে নিয়ে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাআ/এসএ