প্রসঙ্গ : টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৭:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২০

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে খাদ্যশস্য ও ধানের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি)-২ তে উল্লেখ আছে ক্ষুধা থেকে মুক্তি, খাদ্যের নিরাপত্তা বিধান, পুষ্টির মানোন্নয়ন এবং কৃষি ক্ষেত্রে টেকসই কর্মপদ্ধতির বিকাশ সাধন। বর্তমান সরকার কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে নানাবিধ উপায়ে খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যার সঙ্গে পুষ্টি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের সম্পর্ক রয়েছে। প্রকৃতিগত কারণে প্রতি বছর দেশে ০.৪৩ ভাগ হারে কৃষি জমি হ্রাস পেলেও দেশে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে চালের উৎপাদন।

কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে চাল উৎপাদন বাড়ছে বাংলাদেশে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাস বলছে, চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০২০) উৎপাদন ৩ কোটি ৬০ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চীন ও ভারতের পরই তৃতীয় স্থানটি ছিল ইন্দোনেশিয়ার। তবে এবার ইন্দোনেশিয়াকে সরিয়ে সেই অবস্থানে উঠে আসছে বাংলাদেশ।

- Advertisement -

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৯টি লক্ষ্যের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা, সুষম খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নের সঙ্গে কৃষির টেকসই উন্নয়ন সম্পৃক্ত। এই অবস্থায় টেকসই উন্নয়নের জন্য গতিশীল কৃষির অবশ্যই প্রয়োজন আছে। আবার কৃষি এখনো ৪২.৭ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োজনের একটি নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র। জমির স্বল্পতার কারণে প্রান্তিক ক্ষুদ্র শ্রেণির কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে। তারাই এখন দেশের খাদ্য নিরাপত্তার একমাত্র ভরসাস্থল যারা একখণ্ড জমিকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে। তাদের জমিতে যথাযথ প্রযুক্তির উপস্থিতি ঘটালে এবং কর্মসংস্থান বাড়ালে তা টেকসই কৃষি উৎপাদন ও দারিদ্র্যবান্ধব হবে। তারজন্যে প্রয়োজন টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বলতে কৃষিক্ষেত্রে উৎদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কৃষি সরঞ্জাম, হস্ত ও শক্তি চালিত যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি শ্রমিকের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিকে বুঝায়। সাম্প্রতিক সময়ে, প্রচলিত শ্রমিকের মাধ্যমে পরিচালিত অনেক কৃষিকাজ শক্তিচালিত কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। কৃষি কাজের আধুনিকীকরণ কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উন্নয়নের উপর নির্ভর করে যা কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ চারা রোপণ, পরিচর্যা, ফসল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মূল্য-সংযোজনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে উপেক্ষিত হয়েছে। ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত সকল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ইনপুটের কার্যকারীতা এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ভূমিকা অপরিসীম। কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বলতে কেবল কৃষিযন্ত্রপাতি বিকাশের অগ্রগতিকেই বুঝায় না বরং এটি কৃষির পরিবেশ, কৃষির মান, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মতো অনেক বিষয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। এটি সাইট-নির্দিষ্ট এবং গতিশীল যা সময়ের সাথে সাথে কৃষি যন্ত্রপাতির বিকাশ, উদ্ভাবন এবং ব্যবহারের সাথে পরিবর্তিত হয়।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সাথে প্রধানত ট্রাক্টর এবং মেশিনারী সম্পৃক্ত থাকলেও অন্যান্য ইনপুট যেমন উৎপাদন, নির্বাচন, বিতরণ, ব্যবহার, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৃষি কার্যক্রমের সাথে জড়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং তাদের পরিচালনায় বীজ, সার, পানি, কৃষি শ্রমিক এমনকি কৃষি মওসুমও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত । কৃষি কাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রশক্তির অভাবে সর্বদা সময়মত জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, শ্রমিকের কর্মদক্ষতা, শস্য ব্যবস্থাপনা, ফসল কর্তন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উপযুক্ত মূল্য সংযোজনের সাথে আপোষ করতে হয়েছে।

কৃষির যেকোন ক্ষেত্রের উন্নয়ন কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা দ্বারা বোঝা যায়- কোনো দেশের বা অঞ্চলের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা উক্ত দেশের বা অঞ্চলের হেক্টর প্রতি শক্তির (কিলোওয়াট) ব্যবহার, প্রতি একহাজার হেক্টরের জন্য ট্রাক্টরের সংখ্যা এবং ট্র্যাক্টর প্রতি জমির (হেক্টর) পরিমান দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা প্রত্যাশিত মাত্রায় ত্বরান্বিত হয়েছে। এমনকি গত আড়াই দশকে দেশে কৃষিক্ষেত্রে যান্ত্রিক শক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ৫৮ বছরে কৃষি ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৬০ সালে হেক্টর প্রতি ০.২৪ কিলোওয়াট হতে ২০১৮ সালে হেক্টর প্রতি ১.৮২ কিলোওয়াট হলেও জাপান, ইতালি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মত বড় বড় শিল্পায়িত দেশগুলির তুলনায় এখনও অনেক কম।

যান্ত্রিকীকরণের মাত্রা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম (প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি প্রদর্শন, প্রয়োজনীয় এবং গুণগত মানসম্পন্ন মেশিনে ভর্তুকি); কার্যকর সংক্ষিপ্ত, মাঝারি এবং দীর্ঘ মেয়াদী কর্মকৌশল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন; গবেষণা ও উন্নয়নে সক্ষমতা জোরদার করণ; বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন; বাছাইকৃত কার্যকরী কিছু প্রযুক্তির উৎপাদন শিল্প চালুকরণ; বাংলাদেশের ৩০টি কৃষি অঞ্চলের আওতায় ৮৮ টি কৃষি উপ-অঞ্চলের মাটি, ফসল এবং সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নির্বাচন, সনাক্তকরণ এবং প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রতিয়মান হয়।

টেকসই ও কার্যকরী কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে প্রতিটি উপ-অঞ্চলে মাটির প্রকার, ভূমির টপোগ্রাফি, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, ফসলের ধরণ, গড় ফলন, ফলন সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা; কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাব্য চাহিদা, ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতির অগ্রাধিকার চিহ্নিত করে ফসল উৎপাদন ব্যয়, ফসলের তীব্রতা এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থানে অঞ্চল ভিত্তিক প্রভাব এবং খামার যান্ত্রিকীকরণে বর্তমান অবকাঠামোগত সুবিধা এবং ভবিষৎ চাহিদা, বিপণন, বিক্রয়োত্তর পরিসেবা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সুবিধা, খুচরা যন্ত্রপাতি স্থানীয়বাজারে সহজলভ্যকরণ ইত্যাদি বিষয়সমূহ সঠিকভাবে অধ্যয়নের মাধ্যমে কৌশলপত্র প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

টেকসই যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি টেকসই ফসল উৎপাদন নিশ্চিতকরণে সরকারী কৌশল, গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন জিও এবং এনজিওগুলির মধ্যে কার্যকর সংযোগ, অঞ্চল ভিত্তিক সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার র‌্যাঙ্কিং এবং উন্নত ও গুণগতমান সম্পন্ন কৃষিযন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি, পাশাপাশি কৃষিযন্ত্রপাতি উৎপাদন সক্ষমতাবৃদ্ধি, কৃষক দল গঠন, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং সকল পর্যায়ে মান সম্পন্ন খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিতকরণ আবশ্যক। বর্ণিত বহুবিদ পন্থাগুলি সঠিক ভাবে বিবেচনার মাধ্যমেই কৃষির আধুনিকায়ণ তথা টেকসই যান্ত্রিকীকরণ প্রতিষ্ঠা পাবে বলে বিশ্বাস।

লেখক-
ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
ফার্ম মেশিনারি এন্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, গাজীপুর-১৭১০