প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বুড়িগঙ্গার লঞ্চডুবি

প্রকাশিত: ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

ঢাকার শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় মোটর লঞ্চ মর্নিং বার্ড যখন ডুবে যাচ্ছিল, পাশেই নোঙর করা আরেকটি লঞ্চের পেছন দিকে বসে সেই দৃশ্য দেখেন মোহাম্মদ ইদ্রিস, যিনি বিভিন্ন নৌযানে পানি সরবরাহের কাজ করেন।

মঙ্গলবার বিকালে তিনি বলেন, চোখের সামনেই এত অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ঘটনাটি ঘটে যায়, যে তার বুঝে উঠতেও বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে।

- Advertisement -

“দুটো লঞ্চই পশ্চিম দিকে আসছিল, শুরুতে প্রায় পাশাপাশি ছিল। মর্নিং বার্ড উত্তরপাশে, আর ময়ূর-২ দক্ষিণ পাশে ছিল। মর্নিং বার্ড ছিল একটু সামনে। এর মধ্যে ময়ূর-২ এর সঙ্গে ধাক্কা লাগলে মর্নিং বার্ড পুরো ঘুরে যায়। এরপর ময়ূর-২ সেটার ওপর উঠে গেলে মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায় মর্নিং বার্ড।”

ইদ্রিস সদরঘাট এলাকায় একটি কোম্পানির হয়ে লঞ্চে লঞ্চে পানি দেওয়ার কাজ করছেন ১৮ বছর ধরে।

তিনি বলেন, “পুরো বিষয়টা ঘটেছে দশ থেকে বিশ সেকেন্ডের মধ্যে। এত বড় ঘটনা চোখের সামনে দেখেও আমি যেন বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরে দেখলাম অল্প কয়জনে সাঁতরে উঠছে।”

সোমবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে বুড়িগঙ্গা নদীতে ওই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ পাওয়া গেছে। মর্নিং বার্ডের মাস্টার আমির হোসেন ও চালক বাদল হাওলাদারের খোঁজ কেউ দিতে পারছেন না।

বিআইডব্লিটিএ এর পরিবহন পরিদর্শক সৈয়দ মাহফুজুর রহমান বলেন, “ওই দুজন তৃতীয় শ্রেণির মাস্টার ও চালক ছিলেন। শুনেছি দুর্ঘটনার পর তাদের আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়েছিল কেউ। কিন্তু এরপর তাদের আর কোনো খবর কেউ দিতে পারেনি।”

বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম বলেন, সাধারণত এসব ছোট লঞ্চে স্থানীয় মাস্টার ও চালক থাকে। তারা সংগঠনের সদস্য কিনা তা তার জানা নেই।

বিআইডব্লিউটিএর এক কর্মকর্তা জানান, এমএল মর্নিং বার্ডের মালিকের নাম গফুর মিয়া। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

দুর্ঘটনার পর ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, মাস্টার জাকির হোসেন,স্টাফ শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, হৃদয় ও সুকানি নাসির মৃধাসহ অজ্ঞাত নামা পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছে নৌ পুলিশ। তবে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত ওই মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।

লঞ্চ দুটির ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল কিনা জানতে চাইলে বিআইডব্লিটিএর পরিচালক রফিকুল ইসলাম বিডিনিউ্জ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফিটনেস সার্টিফিকেট না থাকলে কোনো লঞ্চকে পন্টুনে ভিড়তে দেওয়া হয় না।”

এ দুর্ঘটনার নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্বও পালন করছেন রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, বুধবার তদন্ত কমিটি চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য শুনেছে, চারজনই প্রায় কাছাকাছি বক্তব্য দিয়েছে।

“দুটি লঞ্চেই পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে আসছিল। ময়ূর-২ লঞ্চ পেছনে এবং মর্নিং বার্ড সামনে ও উত্তরপাশে ছিল। যে লঞ্চটি পেছনে থাকে, সেই লঞ্চের মাস্টার ও চালককে সামনের সবকিছু দেখতে হবে, যে লঞ্চ সামনে থাকে সে লঞ্চতো আর পেছনে দেখতে পায় না।”

দুর্ঘটনার পর সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পেছন দিকে চলতে থাকা ময়ূর-২ এর ধাক্কায় তুলনামূলকভাবে আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়।

সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি সিসিটিভি ফুটেজে যেভাবে ঘটনাটি দেখতে দেখা গেছে তাতে মনে হয়েছে ধাক্কা দেওয়ার বিষয়টি ‘পরিকল্পিত’।