তাহিরপুরে শখে পোষা ৮০০ টাকার কবুতরে লাখপতি চা-বিক্রেতা ফজলু মিয়ার

প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০২০

শাহ আলম,তাহিরপুর(সুুুুনামগঞ্জ): শখে পোষা ৮০০ টাকার এক জোড়া কবুতরেই ভাগ্য বদলে দিয়েছে চা-বিক্রেতা ফজলু মিয়ার। সেই ৮০০ টাকার এক জোড়া কবুতর দিয়েই বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এখন চা-বিক্রেতা ফজলু মিয়া লাখপতি। তাই কথায় বলে, শখের তোলা আশি টাকা। কখনো কখনো এই শখের তোলা কোটি টাকাকেই ছাড়িয়ে যায়। তাই শখের বসে বশ হন না! এমন মানুষ পৃথিবীতে পাওয়া ভার। নানা কাজের ভিড়ে মানুষ যখন যান্ত্রিক হয়ে পড়ে তখন শখের বসে করা এসব টুকিটাকি কাজ তার মনকে প্রফুল্ল করে, প্রশান্তি জোগায়। শখের এ কাজগুলো অনেক সময় আয়েরও উৎস হয়ে উঠে। পৃথিবীতেনানা মানুষের নানা রকমের শখ থাকে। অনেকেরই আছে কবুতর পোষার শখ। সহজে পোষ মানা এই পাখি কারও কাছে পায়রা, কারও কাছে কপোত, আবার কারও কাছে পারাবত নামে পরিচিত। নিজের সৌন্দর্যের কারণে কবুতর সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয় খুব সহজেই। শখের কবুতরের ঘর বাড়ির অল্প পরিসরের জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই দেখা যায় এই পাখিটি। বাংলাদেশসহ অনেক দেশের মানুষ কবুতর পালন করে আসছে আদিকাল থেকেই। সেই শখের বসেই প্রায় দু’এক আগে কবুতর কিনেছেন চা-বিক্রেতা ফজলু মিয়া। শখ করে মাত্র ৮শ টাকায় একজোড়া কবুতর নিয়ে লালন পালন করা শুরু করে এখন সফল একজন কবুতর খামারি তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বাদাঘাট ইউনিয়নের বাদাঘাট গ্রামের মো. ফজলু মিয়া(৩০)। পেশায় একজন চা বিক্রেতা। পায়রা বা কবুতর শান্তির প্রতীক এই পাখিটি তার ভালো লাগার একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে রীতিমতো। কেউ কবুতর পালন করেন শখের বশে আবার কেউ ফজলু মিয়ার  মতো আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য। ফজলু মিয়া পেশায় একজন চা বিক্রেতা । প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো পড়ালেখার সুযোগ হয়নি তার। বাড়ির পাশেই বাদাঘাট বাজার। সেই বাজারেই  তার নিজেস্ব ঘরে একটি চা-স্টল। প্রতিদিন ভোর সকল থেকে রাত ১২ পর্যন্ত দোকানে চা বিক্রি করাই তার মূল পেশা। সপ্তাহে ২ দিন( বৃহস্পতি আর রবিবার) বাজারের হাট বার। ওই ২দিন বাহারে ফজলু মিয়ার চা- এর দোকানের পাশেই কবুতর বিক্রি করতে আসে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কবুতর খামারি ও সৌখিন কবুতর পোষা মালিকরা। বাজারে তাদের কবুতর বিক্রি দেখে আর আলাপ চারিতা শুনে শখ জাগে কবুতর পালনে। সেই শখ থেকেই ২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফজলু মিয়া প্রথমে এক জোড়া কবুতর কিনেন ৮০০ টাকায় । দেশীয় জাতের ১ জোড়া কবুতর ৮শ টাকায় নিয়ে শখের কবুতর পোষা শুরু করে সে। দেশী জাতের ওই সুন্দর এক জোড়া কবুতর গুলো বিক্রি করতে মন চাইল না তার। কিছুদিন যেতে না যেতেই ওই কবুতর থেকে বাচ্চা হয়, পরে বাচ্চা গুলো বড় হতে হতে তারাও নতুন করে বাচ্চা দেয় কবুতর গুলো । এভাবে ধীরে ধীরে কবুতরের সংখ্যা বাড়তে থাকে তার। তা দেখে পরিকল্পনা এলো ফজলু মিয়ারএকটি খামার করার। যে ভাবা সেই কাজ। শখ করে কবুতর পোষে বর্তমানে তার বাড়ির আঙ্গিনায় ২৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০ ফুট প্রস্থের ছোট্ট একটি খামার গড়ে তোলেন। তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন সেখানে একটি পাখীর খামার গড়ে তোলার। আশায় বুক বাঁধেন বড় একটি খামার হবে তার। পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাবে তিনি কবুতরের খামারের সম্প্রসারণ করেন। তার ব্যবসারও প্রসার ঘটতে থাকে। এখন তার খামারে রয়েছে দেশীয় জাতের পাশাপাশি বিদেশী জাতের হোমার, রেড সিরাজী, গিরিবাজ, ময়ুরপঙ্খী, চায়নাসহ ১০/১৫ জাতের কবুতর। বর্তমানে ১০০ জোড়া কবুতর রয়েছে তার খামারে। খামার দেখাশোনা কোনো কর্মচারী নেই তার। সারাদিন চা-এর দোকানের কাজের ফাঁকে ফাঁকে খামারে নিজেই  কাজ করছেন। খামারে তার দেশী ও বিদেশি ১০০ জোড়া কবুতরের  বর্তমান বাজার দাম হিসাব করলে লক্ষাধিক টাকার কবুতর আছে তার খামারে। খামারি ফজলু মিয়া জানান, প্রতি মাসেই খাদ্য ও ওষুধপত্রের খরচ ৫/৬ হাজার টাকা বাদে প্রতি মাসে তার লাভ হয় ২৫/৩০ হাজার টাকা। এর পাশাপাশি ফজলু মিয়া বাদাঘাট বাজারের একজন প্রতিষ্ঠিত চা বিক্রেতা (ব্যবসায়ী)।  যা দিয়ে তার সংসার চলে স্বাচ্ছন্দ্যে। শখের কবুতর খামার থেকে এখন সে লাখপতি। তার কবুতরের খামার থেকে প্রতিমাসে যে আয় হয় তা থেকে তার চায়ের দোকান সম্প্রসারণ করা সহ গড়েছেন দেশী প্রজাতির উন্নত জাতে আরও একটি গরুর খামার। এই কবুতরের খামারের আয় থেকে প্রথমে ৩০ হাজার টাকায় ১টি গরু কিনেন ফজলু মিয়া। পরে একে একে ৩টি গরু কিনেন ১লক্ষ্য ৫০ টাকায়।  যার বাজার মূল্য এখন প্রায় ৪ লাখ টাকার উপরে। তিনি খামারে এখন সে এখন আরও নানা জাতের দামী  কবুতর তুলতে চায় তার খানারে। বর্তমানে প্রতিদিনই এলাকার কোনো না কোনো সাধারণ ক্রেতা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কবুতর ব্যবসায়ীর সমাগম থাকে তার খামারে। বিদেশি জাতের ৭/৮ হাজার টাকা দামের কবুতরের সংখ্যাও কম নাই তার খামারে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শখের বশে কেনা ৮শ টাকার ১ জোড়া কবুতরই ছিল তার মূলধন। বর্তমান খামারে গড়ে উঠা শতাধিক জোড়া কবুতর তার ওই ১ জোড়া কবুতরের মূলধন থেকেই। তিনি নতুন কোনো মূলধন বিনিয়োগ করেননি এ পর্যন্ত। ওই ৮০০ টাকার এক জোড়া কবুতর থেকেই এখন তার কবুতরের পাশাপাশি ৪ টি দেশীয় উন্নত জাতে ১ টি গরুর খামারও আছে। যার বাজার মূল্য এখন ৪ লক্ষ্য টাকার উপরে। সেই শখের ১ জোড়া কবুতর দিয়ে খামার শুরু করা চা বিক্রেতা ফজলু মিয়ার এখন আর পিছনে ফিরে থাকাতে হয়না। দিনের বেলায় খাদ্য সরবরাহ করে থাকে তার স্ত্রী। সারাদিন চা-স্টলে চা বিক্রির কাজ ফাঁকে ফাঁকে সময় দেন কবুতর আর গরুর খামারে। কোনো কবুতর অসুস্থ হয়েছে কিনা তা নিজেই চিহ্নিত করে তার চিকিৎসা তিনি নিজেই দিয়ে থাকেন বলে জানান ফজলু মিয়া। কবুতরের রোগবালাই শীতকালে একটু দেখা দিলেও অন্যান্য ঋতুতে কবুতরের রোগবালাই হয় খুব কমই। তার মতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কবুতর বেড়ে উঠা কবুতরের রোগবালাই তেমন হয় না। ফজলু মিয়া আরও জানান, কবুতরের পাশাপাশি এখন গরুর খামার করায় তার খরচের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গেল কয়েকদিন আগে এনজিও সংস্থা আশা থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ তুলেন। যদি  খামারিদের সরকারিভাবে ঋণ দেয়া হতো তাহলে আমার এই কবুতর ও গরুর খামার বড় পরিসরে করা চিন্তা ভাবনা ছিল। বাদাঘাট বাজারের পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, চা-বিক্রেতা মো. ফজলু মিয়া একজন পাখি প্রেমিক মানুষ। তিনি ক্ষুদ্র আকারে কবুতরের খামার করে এখন সফল কবুতর খামারি হয়েছেন। এই কবুতর খামার থেকেই এখন ফজলু মিয়া একজন সফল গরুর খামারিও।