জঙ্গি সনাক্তকরণ লিফলেটের প্রতিবাদে ক্ষোভের উত্তাপ সোশ্যাল মিডিয়ায়

প্রকাশিত: ৯:৪৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১০, ২০১৯

গতকাল ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে বাংলাদেশের অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকায় ‘সন্দেহভাজন জঙ্গি সদস্য সনাক্তকরণের (রেডিক্যাল ইন্ডিকেটর) নিয়ামকসমূহ’ নামে একটি পোষ্টার ছাপানো হয়।

সেখানে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের জন্য কিছু লক্ষণের কথা বলা হয়। যে লক্ষণগুলো দেখলে তাকে জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করা যাবে। সেই সন্দেহের মধ্যে ইসলামের আবশ্যক পালনীয় দাড়ি রাখা, টাখনুর উপর কাপড় পড়াসহ বেশ কিছু লক্ষণকে জঙ্গি লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পোষ্টারে উল্লিখিত জঙ্গি লক্ষণের মধ্যে রয়েছে- ধর্ম চর্চার প্রতি ঝোঁক; গায়ে হলুদ, জন্মদিন পালন, গান বাজনা ইত্যাদি থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা; মিলাদ, শবেবরাত, শহীদ মিনারে ফুল দেয়াকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করা ইত্যাদি।

পূর্বে এধরণের পোষ্টার আইনশৃঙ্খলাবাহিনী কর্তৃক প্রচারিত হলেও গতকালকেরে এই পোষ্টারটির নিচে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠনের নামে প্রকাশ করা হয়েছে।

জানা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতার স্লোগানকে ধারণ করে গত বছরের জুলাই মাসে এই সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। এর আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার ৪টি ধাপের কথা বলা হয়েছে পোষ্টারে। তার প্রথম ধাপেই রয়েছে- তাওহীদ, শিরক, বেদাত, ঈমান, আকীদা, সালাত, ইসলামের মূলনীতি, দাওয়া ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা করা।

এদিকে ইসলামের মৌলিক রীতি নীতিকে জঙ্গিবাদের লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের একজন হলেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক সোহেল নওরোজ। তিনি এই লিফলেটের প্রতিবাদ জানিয়ে তার ফেসবুকে লিখেন-


‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ এর ব্যানারে কিছু বিধর্মী ও ইসলামবিদ্বেষী রোজার মাসে মুসলমানদের সাথে চূড়ান্ত ফাজলামো করে যে দফাগুলো দিয়েছে তার অনেকগুলোই সরাসরি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ইসলাম সর্বদা শান্তির কথা বলে। মুসলমান কোরআন ও হাদিসের বাইরে কারো নির্দেশনার মুখাপেক্ষী হতে পারে না। নবীর সুন্নতকে জঙ্গিয়ানী আখ্যা দেওয়ার ধৃষ্টতা এরা কোথায় পায়? আমার তো মনে হয় মুসলিম সম্প্রীতি বিনষ্ট করার বড় কোনো এজেন্ডা নিয়েই এরা মাঠে নেমেছে। আল্লাহ্ আমাদের হেফাজত করুন।
তাদের কথা যদি মানতে হয় তবে, সন্দেহমুক্ত যুবসম্প্রদায় সনাক্তকরণের নিয়ামকসমূহ কেমন হবে একবার দেখুন :
ক। ধর্ম বিষয়ে একেবারেই পড়াশোনা থাকবে না।
(অথচ পবিত্র কোরআনের প্রথম নাজিলকৃত শব্দ ‘পড়ো’!)
খ। বহির্মুখী স্বভাবের হবে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কথা বলবে, গ্যাজাবে, একে-ওকে কাঠি মারবে।
(অথচ মহানবীর শিক্ষা অপ্রয়োজনে কথা না বলা। চুপ থাকা।)
গ। রুমে থাকবে না। ঝোপে-জঙ্গলে সময় কাটাবে। মাঝেমধ্যে রাস্তা-ঘাটে টাল হয়ে পড়ে থাকতে পারে।
ঘ। নবীজীর সুন্নত মানবে না। সবসময় ক্লিন শেভড থাকবে, প্যান্ট পায়ের তলায় ছেঁচড়ে বেড়াবে। হাতে-পায়ে-শরীরে ট্যাটু, রিং এসব থাকতে পারে।
ঙ। এলাকায় বিয়েশাদি, গানবাজনা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে সবার আগে হাজির থাকবে। এসব মেইনটেইন করতে গিয়ে একটু টানাটানি, ছ্যানাছ্যানি হতেই পারে।
চ। মুসলমান মরলে তালিয়া বাজাবে, অন্য কারো ক্ষতি হলে প্রতিবাদ, মানববন্ধন করবে। শোকে নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাবে।
ছ। ভুলেও ফরজ নামাজ পড়বে না। তবে মিলাদ, ‘বইস্যা যান’ টাইপের জিকির হলেই সবার আগে দৌড়াবে।
জ। কানা বাবা, জটা বাবা, পেটলাবাগীর মুরিদ হলে তো কথাই নেই!


বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মুফতী সাখাওয়াত হুসাইন রাজি  এই লিফলেটের প্রতিবাদ জানিয়ে তার ফেসবুকে লিখেন-


একজন খ্রিস্টান জঙ্গি যখন মসজিদে আক্রমণ করে কিংবা জরিপে যখন একথা প্রকাশিত হয় যে, আমেরিকায় ৭৩ ভাগ সন্ত্রাসী হামলার জন্য খ্রিস্টান সন্ত্রাসীরা দায়ী তখন সেই জঙ্গিদের আচার-আচরণ কিংবা ধর্ম পালনের রীতি-নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠে না। নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর ধারাবাহিক ইজরাইলি ইহুদিদের সন্ত্রাসী হামলার পর কেউ ইহুদীদের ধর্মীয় বিধিবিধান কিংবা শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। নিউজিল্যান্ডের মসজিদে আক্রমণের পরে খ্রিস্টান জঙ্গির ধর্ম পালন, ধর্ম বিশ্বাস কিংবা উস্কানিদাতাদের নিয়ে কেউ কথা বলেনি। তখন সবাই বলেছে ধর্মের সঙ্গে সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় যখন সন্ত্রাসী হামলা হলো দুইশত আলেমকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হল, বোরকা নিষিদ্ধ করা হলো, কাদের বক্তিতা কিংবা লেকচার শুনে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছে তাদেরকে খুঁজে বের করতে অভিযান চালানো হলো। কেননা, হামলাকারী মুসলিম।

দুর্নীতি দেশের এক নম্বর সমস্যা; কিন্তু দুর্নীতিবাজ শনাক্তকরণের জন্য রেডিক্যাল ইন্ডিকেটর তৈরি করা হয় না। মাদক দেশের বড় সমস্যা; কিন্তু মাদক ব্যবসায়ী শনাক্তকরণের জন্য ইন্ডিকেটর তৈরি করা হয় না। কেননা দুর্নীতিবাজ আর মাদক ব্যবসায়ী শনাক্তকরণের জন্য ইন্ডিকেটর তৈরি করা হলে সেই ইন্ডিকেটর ওয়ালারা-ই চিপায় পড়ে যাবে।

একজন দুর্নীতিবাজ ও মাদক ব্যবসায়ী শার্ট প্যান্ট পরিধান করে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রেডিক্যাল ইন্ডিকেটর প্রস্তুতকারীরাও শার্ট প্যান্ট পরিধান করে। একজন দুর্নীতিবাজ ও মাদক ব্যবসায়ী গান শুনে, টেলিভিশন দেখে, গায়ে হলুদে যায়, মাজারে যায়, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইন্ডিকেটর প্রস্তুতকারীরাও গান শুনে, টেলিভিশন দেখে, গায়ে হলুদে যায়, মাজারে যায় ইত্যাদি। এজন্যই তারা দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে ইন্ডিকেটর প্রস্তুত করতে পারে না। কেননা ইন্ডিকেটর তাদের দিকেই যাবে তাদের ফর্মুলা অনুযায়ী।

আর এ থেকে কি এ কথা স্পষ্ট হয় না যে, ইসলামের দুশমনেরা-ই জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি করে ইসলাম নির্মূল করতে চায়? কেননা জঙ্গি মুসলিম হলেই তারা ইসলামের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ অন্য ধর্মের কেউ জঙ্গি হলে তার ধর্ম পরিচয় প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে।

পশ্চিমাদের কথা কি বলব? এদেশে তাদের মদদপুষ্ট কিছু এজেন্ট আছে যারা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতার নামে ইসলামকে কলঙ্কিত করতে চায়। শুধু তাই নয়, আসলে ওরা ইসলামী ভাবধারা ও ইসলামের শেষ চিহ্নটুকু মুছে দিতে চায়। সম্প্রীতি বাংলাদেশ নামে কথিত এনজিও তাদের অন্যতম। এই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে অচিরেই জেগে উঠবে বাংলাদেশ, ইনশাল্লাহ।


- Advertisement -

এছাড়াও সাধারণ ধর্মীয় মুসলমানারা এসব বিষয় জঙ্গিবাদের লক্ষণ থেকে অপসারণের দাবি জানান। পাশাপাশি, সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহবায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্যান্য সকলের বিরুদ্ধে অতিসত্তর দৃষ্টান্তমূলক ব্যাবস্থা গ্রহন করারও জোরালো জানান ।