একজন মহান শিক্ষক ও গবেষক

প্রকাশিত: ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

আমি কোন লেখক না তাই লেখার সাহস করি না আর সেটা যদি হয় কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তিকে নিয়ে তাহলে তো সেই ধৃষ্টতা দেখানোর প্রশ্নই আসে না। তবে আজ একজনকে নিয়ে লিখতে হচ্ছে যাঁকে নিয়ে কিছু না বললে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ না করার আক্ষেপ থেকে যাবে। প্রফেসর ড. মোঃ নুরুল ইসলাম স্যার। যদি এক কথায় বলি স্যার একজন আপাদমস্তক সাদা মনের মানুষ। দল-বল নির্বিশেষে সকলের কাছে সমানভাবে সমাদৃত একজন মানুষ।

শিক্ষক হিসেবে: বর্তমানে পশুপালন অনুষদের সবচেয়ে প্রবীনতম শিক্ষক। ছাত্রবান্ধব শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের মনের মনিকোঠায় সবসময়ই স্যারের অবস্থান । স্যারের ক্লাস সর্বপ্রথম পেয়েছিলাম ২০১৬ সালে তখন লেভেল-১ সেমিস্টার-২ তে পড়ি। তারপর থেকে আর মিস হয় নাই খুব একটা, সব লেভেলেই কম বেশি সবসময়ই পেয়েছি পিতৃতুল্য স্যারকে। ডিনশিপ শুরু হওয়ার সাথে সাথে ব্যস্ততাও বেড়ে গিয়েছিল তবুও স্যার ক্লাসের ব্যাপারে বরাবরের মতোই নিয়মিত। স্যারের সহজসরল ভাষা অনেক কঠিন বিষয়গুলোকেও সহজতর করে দিতো ফলশ্রুতিতে স্যারের ক্লাসে সবসময়ই সবার আলাদা মনোযোগ থাকতো ।

- Advertisement -

ডিন হিসেবে: স্যারের ছাত্র হওয়ার দরুন ছাত্র-শিক্ষক সুসম্পর্কের পাশাপাশি পশুপালন অনুষদের ডিন একাধারে ছাত্রসমিতির সভাপতি থাকায় সেটা আরও বেড়ে গিয়েছে। আমাদের পশুপালন অনুষদ তথা পশুপালন অনুষদে ছাত্রসমিতির সর্বোচ্চ অভিভাবক। যাইহোক স্যারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ পথচলা শুরু হয় স্যারের ডিনশিপ শুরু হওয়ার দিন থেকেই। স্যারকে নানাভাবে বিরক্ত করেছি। এমনও হয়েছে রাত ১০ টার পরও স্যারকে ফোন দিয়ে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের অথবা প্রফেশনাল কাজের বিষয়ে কথা বলেছি।এক মূহুর্তের জন্যও মনে হয় নি স্যার বিরক্ত হয়েছেন কিংবা বলেছেন পরে কথা বলবো। বরং সবকিছু অবাক করে দিয়ে স্যার আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং সেই অনুযায়ী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং এখনও সেটা করে যাচ্ছেন। ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষের দিকে এসে তিনি ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একজন ক্রীড়া অনুরাগী: ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন স্যারের ডিনশিপ সময়ে সবচেয়ে বেশি হয়েছে। যখনই যা আবদার করেছি সবকিছুই স্যারের সময়ে পেয়েছি। স্যারকে আমরা সবসময়ই একজন ক্রীড়াবান্ধব মানুষ হিসেবেই দেখেছি পেয়েছিও। স্যারের নেতৃত্বে ছাত্রশিক্ষক সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ছাত্র-শিক্ষক প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের পাশাপাশি ছাত্রসমিতির মাধ্যমে নানা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। সর্বোপরি একজন শিক্ষক যে বাবা হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের ডিন স্যার। স্যারের কাছে সকলেই সমান ভাবে সমাদৃত হয়েছে।

ছাত্রবান্ধব শিক্ষক হিসেবে: স্যারকে নিয়ে ব্যাচ-৫২ এক্সকারশনে যাওয়ার ব্যাপারটা আমাদের কাছে মাইলফলক স্বরুপ। কোন ফ্যাকাল্টির ডিন স্যার ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক্সাকারশনে যাওয়ার ব্যাপারটা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসে বিরল। এতো বয়সের ভারেও স্যার ছিলেন চিরতরুণ। স্যারের লাইফের ফাস্টটাইম সেন্টমার্টিন যাওয়া, ফাস্ট সেলফি তোলা কিংবা লাইভে এসে গান গাওয়ার বিরল মূহুর্তের অংশ হতে পেরে নিশ্চয়ই ব্যাচ-৫২ খুবই গর্বিত।

নতুন সিলেবাস প্রণয়ন: আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তালমিলিয়ে লাইভস্টোক সেক্টরকে আরও টেকসই করার লক্ষে স্যারের নেতৃত্বে পশুপালন অনুষদের সিলেবাসকে আপগ্রেড করা হয়েছে। পূর্বের ১৯২ ক্রেডিটের বিপরীতে সেটা আরও আধুনিকায়ন করে ১৬৩ ক্রেডিটে সাজানো হয়েছে। যা পশুপালন অনুষদের জন্য একটা যুগান্তকারী অধ্যায় বলে আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে বিশ্বাস করি। নতুন সিলেবাস প্রণয়ন নিয়ে যদি বলি স্যারকে আমি প্রায়ই দেখতাম সবসময় এইটা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। নানা ডকুমেন্টস গুলো নিজে পড়তেন আর টাইপের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার জন্য কোন স্যার ওনাকে হেল্প করতেন। আমি নিজেও একদিন স্যারের সাথে এইটা নিয়ে কাজ করেছি। ওইদিন স্যারের ছেলে আর ছেলের স্ত্রী স্যারের অফিসে এসেছিলেন। ওনারা পাশেই বসে ছিলেন অথচ স্যার সিলেবাস নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন নিজের মতো করেই। হঠাৎ স্যারের মনের হলো ওনার ছেলে-আর ছেলের বউ এসেছেন । তারপর আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম তাদের পরিবারে স্যারের অবস্থান কেমন? দুইজন একসাথেই বললেন ” আব্বা আমাদের পরিবারের একজন “সুপার হিরো “। এইটা শুনে স্যার মুচকি হেসে বললেন আরে না সবাই সবার যায়গায় হিরো। হ্যাঁ সত্যিই স্যারের পরিবারের মতো পশুপালন অনুষদ পরিবারেও স্যার একজন সত্যিকারের হিরো।

নতুন গেইট নির্মাণ: পশুপালন অনুষদের গেইট সংক্রান্ত কাজে জটিলতার অন্ত ছিল না। সবসময়ই আক্রমণের শিকার হয়েছেন শুনতে হয়েছে নানান বাজে কথা। কিন্তু স্যার ওনার নিজের কাজ ঠিকই করে গেছেন,নিজে রাত দিন পরিশ্রম করেছেন, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সর্বক্ষণ গেইটের কাজের তদারকি করেছেন। স্রোতের বিপরীতে ঠান্ডা মাথার মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়ে স্যার নিজের সেরাটা দিয়ে নিন্দুকের জবাব দিয়েছেন। উপহার হিসেবে দিয়েছেন সুন্দর একটা গেইট। নানা কথার বিপরীতে স্যার বারবার বলেছেন,” গেইট কিভাবে আরও সুন্দর করা যায় সেই পরামর্শ দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো “। গেইট সংক্রান্ত বিষয়ে ছাত্রদের কোন হট্টগোলে না যেতে বারবারই বারণ করেছেন। বলেছেন যতদিন তোমাদের শিক্ষকরা আছে ততদিন তোমাদের এইসবে আসতে হবে না, তোমরা তোমাদের পড়াশোনা কর।

প্রফেশনাল নেতৃত্বে: পশুপালন অনুষদের সাথে আন্দোলন সংগ্রাম যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। নানা আন্দোলনের সময় বিশেষ করে বিসিএসের পোস্টের আন্দোলনে অনেক বেশি Excitement কাজ করতো, কারো কথা শুনতে চাইতাম না কিন্তু ডিন স্যার যখন বক্তব্য বা কথা বলতেন কেন জানি নিমিষেই সমস্ত রাগ, অভিমান ও উত্তেজনাগুলো শেষ হয়ে যেতো। স্যার প্রফেশনাল কাজে একজন নিবেদিত প্রাণ। আজীবন পশুপালন অনুষদের গ্রাজুয়েটদের চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করে গেছেন এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। স্যার বর্তমানে পশুপালন অনুষদের গ্রাজুয়েটদের জন্য প্রফেশনাল কমিটি বাংলাদেশ অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রী এসোসিয়েশন (বাহা) -এর সম্মানিত সভাপতি। পাশাপাশি একজন মিল্ক স্পেশালিষ্ট হিসেবে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক জ্ঞাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনের ডেইরি এন্ড ডেইরি পণ্য সাব-কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

আমি ব্যক্তিগত জীবনে অনেক বেশি স্যারকে জ্বালাতন করেছি। স্যারকে ফোন দেওয়ার সময় সময়ের ব্যাপারে উদাসীন ছিলাম সবসময়। যেকোনো প্রয়োজনে স্যারকে ফোন দিয়েছি। ধৈর্য্য শক্তির এক অনন্য নিদর্শন আমাদের স্যার। ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্যগুলো সময় নিয়ে শুনার মতো ধৈর্য্য হয়তো অন্য কারো নেই। বরাবরের মতোই স্যার আমার কথা সবসময়ই মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং সেই অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিতেন কিংবা দিকনির্দেশনা দিতেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন: ১৯৫৫ সনের ৩১ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। শিক্ষা জীবনে কৃতিত্বের অধিকারী প্রফেসর ড. মোঃ নুরুল ইসলাম ১৯৭৮ সনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএসসি ইন এএইচ (অনার্স) এবং ১৯৭৯ সালে এমএসসি ইন ডেয়রি সায়েন্স ডিগ্রী লাভ করেন।

পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অভ এবারডিন থেকে ১৯৮৫ সনে পিএইচ.ডি ও ১৯৯৫ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে পোস্ট ডক্টরেট অর্জন করেন। প্রফেসর ড. মোঃ নুরুল ইসলাম ১৯৮১ সনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেয়রি বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭সনে প্রফেসর পদে উন্নিত হন।

গবেষক হিসেবে: প্রফেসর ড. মো. নুরুল ইসলাম পশুপালন এবং ডেইরি বিষয়ক ১৪০টি গবেষণামূলক প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্ণালে প্রকাশিত করেছেন।

তিনি ১০জন পিএইচডি ছাত্র-ছাত্রীসহ ১৫২ জন মাস্টার্স এর শিক্ষার্থী সুপারভাইজ করেছেন। এছাড়া তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওর্য়াকশপ ও কনফারেন্সে যোগদান করে গবেষণালব্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং বিভিন্ন টেকনিক্যাল সেশনে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গবেষণা ও শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে পৃথিবীর বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন।

স্যারের শিক্ষকতার সফল ৩৯ বছরের কর্মজীবনের হয়তো সমাপ্তি আজকে হলো কিন্তু এখনো দেওয়ার মতো অনেক কিছু বাকী আছে। প্রফেশনাল কাজে স্যার আরও বেশি কাজ করবেন পাশাপাশি পশুপালন অনুষদের গ্রাজুয়েটদের প্রাণের দাবি তথা দেশের লাইভস্টোক উন্নয়ন ও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে পশুপালন অনুষদের গ্রাজুয়েটদের জন্য প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পোস্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন বলে আশাকরি। আল্লাহ তায়ালা স্যারকে সুস্বাস্থ্যের সাথে দীর্ঘায়ু দান করুন।

লেখক-
আব্দুল্লাহ আল নোমান নাঈম
সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত)
পশুপালন অনুষদ ছাত্রসমিতি।
(অনুলিখন- আশিকুর রহমান, সাংবাদিক)